চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের সমাজচিত্রে তৎকালীন মধ্যযুগীয় বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক অবস্থা, পেশা, সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, বিবাহ পদ্ধতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস এবং সামাজিক বিভাজন ফুটে উঠেছে, যেখানে কৃষিকাজ, বণিকবৃত্তি, শ্রমজীবী পেশা, এবং মুসলমান সমাজের প্রভাবও লক্ষণীয়। এই কাব্যগুলো শুধু দেবদেবীর মাহাত্ম্যই প্রচার করেনি, বরং সমাজের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-কষ্ট, এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা দিক চিত্রিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা
★বণিকবৃত্তি ও কৃষি:
ধনপতি সওদাগরের মতো বণিক চরিত্রগুলোর মাধ্যমে তৎকালীন বাণিজ্যিক কার্যকলাপ, বিশেষ করে সিংহল ও অন্যান্য অঞ্চলে বাণিজ্য করার চিত্র পাওয়া যায়। আবার, কালকেতু ও ফুল্লরার মতো চরিত্রগুলো কামার, কুমার, জেলে, শাঁখারী, তাঁতি, কৃষক ইত্যাদি বিভিন্ন পেশার মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও আর্থিক অবস্থা তুলে ধরে।
★সামাজিক বিভাজন:
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অবস্থান বর্ণিত হয়েছে। ধনী-গরিব, উচ্চ-নিচ শ্রেণীর মানুষের মধ্যেকার পার্থক্য এবং তাদের জীবনযাত্রার চিত্র এতে সুস্পষ্ট।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন
★ধর্মীয় বিশ্বাস:
দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য কীর্তনের পাশাপাশি, কাব্যগুলোতে স্থানীয় লোকদেবীর প্রভাব এবং পরে পৌরাণিক দেবীর সাথে তাঁর অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চিত্র দেখা যায়। এছাড়াও, মুসলমান সমাজের রোজা রাখা, ঈদ-পূজা করা, সিরনি পাক করা ইত্যাদি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতির বর্ণনাও পাওয়া যায়।
★সাংস্কৃতিক পরিবেশ:
তৎকালীন সমাজের বিবাহ অনুষ্ঠান, মক্তবে শিশুদের কোরান শিক্ষা, এবং বিভিন্ন সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠানের বিবরণ কাব্যগুলোতে পাওয়া যায়।
মানুষের জীবনযাত্রা ও পেশা
★পেশাগত জীবন:
কালকেতুর মাধ্যমে তৎকালীন শিকারি-কৃষক জীবন এবং পরে তার পশুশালা প্রতিষ্ঠা ও পশুপালন ও বিক্রির চিত্র অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে।
★দৈনন্দিন জীবন:
মানুষের দাড়ি-টুপি ও বসন-ভূষণ, খাওয়া-দাওয়া, সামাজিক মেলামেশা, এবং সাধারণ মানুষের আড়ম্বরহীন জীবনযাত্রার চিত্র কাব্যগুলোতে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়।
★রাজনৈতিক অবস্থা
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন, যা তাঁর কাব্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।