Friday, June 27, 2025

সুলাইমান (আ.) নবী এবং বাদশা: শিক্ষা, হিকমাহ ও নীতিমূলক বিশ্লেষণ



১. ভূমিকা:


নবী সুলাইমান (আ.) ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি ছিলেন একই সাথে একজন নবী ও একজন বাদশাহ। তাঁর শাসনকাল ছিল জ্ঞান, প্রযুক্তি, ন্যায়বিচার, দাওয়াহ ও কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি কেবল মানুষ নয়, বরং জিন, পশু ও পাখির প্রতিও প্রভাব বিস্তার করতেন। আল্লাহ সুলায়মানের জন্য অনুগত করে দিয়েছিলেন প্রবল বাতাসকে, যা তার নির্দেশে প্রবাহিত হত। কুরআনের একাধিক সূরায় সুলাইমান (আ.)-এর কাহিনী আলোচিত হয়েছে, যা থেকে বহু নৈতিক শিক্ষা ও হিকমাহ পাওয়া যায়।


২. সুলাইমান (আ.)-এর পরিচিতি ও দাওয়াতি জীবন:


সুলাইমান (আ.) ছিলেন নবী দাউদ (আ.)-এর পুত্র এবং উত্তরসূরি। তিনি নবুওত ও রাজ্য—উভয়ই লাভ করেছিলেন। নবী ও বাদশাহ—দুই ভূমিকারই উত্তরাধিকারী। আল্লাহ তাঁকে অসাধারণ জ্ঞান, বিচারবুদ্ধি ও অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছিলেন। তিনি ছিলেন অনন্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী (সূরা আন-নামল ২৭:১৬)। তিনি দাওয়াহ ও নেতৃত্বকে একত্রে প্রয়োগ করে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে প্রজ্ঞা ও কৌশলে বিজয় অর্জন করেন। দাওয়াতি ভূমিকা: ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নম্রতা ও আল্লাহর প্রতি ভয়। রাণী বিলকিসের (সাবার রাণী) ইসলাম গ্রহণ—সুলাইমান (আ.)-এর বুদ্ধিদীপ্ত দাওয়াহর ফল (সূরা আন-নামল ২৭:৪৪)। তাঁর দাওয়াতি কার্যকলাপ বিশেষভাবে প্রকাশ পায় রাণী বিলকিসের ইসলাম গ্রহণের ঘটনায়।  


৩. পিতা ও পুত্রের বিচার-ফায়সালায় শিক্ষা ও হিকমাহ:


দাউদ (আ.) ও সুলাইমান (আ.)-এর ফয়সালার ঘটনা একটি অসাধারণ বিচার ঘটনা হিসেবে কুরআনে আলোচিত হয়েছে। সুলাইমান (আ.)-এর বিচারবোধের প্রথম প্রকাশ ঘটে তখন, যখন এক কৃষক অভিযোগ করেন যে রাতে একজনের গৃহপালিত মেষ তার ফসলের ক্ষতি করেছে। নবী দাউদ (আ.) রায় দেন, ক্ষতিপূরণ হিসেবে পশুগুলো কৃষককে দেওয়া হবে। কিন্তু তখন তরুণ সুলাইমান (আ.) বিকল্প এবং আরও সুবিচারপূর্ণ প্রস্তাব দেন: কৃষক সাময়িকভাবে পশুগুলো ব্যবহার করবেন এবং তাদের দু্ধ পান করবেন, আর পশুর মালিক জমি সংস্কার করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেবেন। কুরআন এ বিষয়ে বলে: “আমরা তা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম সুলাইমানকে এবং উভয়কেই দিয়েছিলাম হিকমাহ ও জ্ঞান।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৭৮–৭৯)। শিক্ষা: ন্যায়বিচারে যুক্তি ও ভারসাম্যের গুরুত্ব এবং পিতার প্রতি পুত্রের সম্মান বজায় রেখে মতপ্রকাশের শৈলী।


৪. সুলাইমান (আ.) এবং রাণী বিলকিসের কাহিনীতে শিক্ষা ও হিকমাহ:


সূরা আন-নামল (আয়াত ৩০–৪৪)-এ বর্ণিত এই ঘটনা সুলাইমান (আ.)-এর দাওয়াতি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। তিনি রাণী বিলকিসের কাছে মার্জিত ভাষায় চিঠি পাঠান, যা অহংকার পরিহার করে ইসলামের দিকে ডাকে। রাণী বিলকিস সাড়া দেন রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বলেন: “আমি সুলাইমানের সঙ্গে বিশ্বজগতের রব্ব আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করছি।” (সূরা নামল: ৪৪)। হিকমাহ: শান্তিপূর্ণ দাওয়াহ, নারীর নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কৌশলের সংমিশ্রণ এবং অহংকারের বিপরীতে বিনয় ও জ্ঞান।


৫. সুলাইমান (আ.)-এর সালাত মিস হওয়া এবং শিক্ষা ও হিকমাহ:


সূরা সাদ (৩৮:৩১–৩৩)-এ এক ঘটনার উল্লেখ আছে যেখানে সুলাইমান (আ.) ঘোড়ার প্রতি মুগ্ধ হয়ে পড়ায় তাঁর সালাত মিস হয়। পরবর্তীতে তিনি বলেন: “আমি তো আমার রবের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে ঐশ্বর্যের প্রেমে মগ্ন হয়ে পড়েছি... অতঃপর তিনি ঘোড়ার ঘাড় ও পায়ে হাত বুলাতে লাগলেন।” তাফসীরকারদের মতে, এটি হয়তো কুরবানীর প্রতীক, অথবা ঘোড়ার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ, যা আত্মসমালোচনার প্রতীক। শিক্ষা: ইবাদতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া, আত্মসমালোচনার জায়গা থাকা এবং নেতৃত্বে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ববোধ।


৬. সুলাইমান (আ.)-এত বাহিনী (জ্বিন, মানুষ ও বিহংগকুল) এবং পিপিলিকার ঘটনা - শিক্ষা ও হিকমাহ:


নবী সুলাইমান (আ.)-এর বাহিনী ছিল এক অনন্য মিশ্র বাহিনী, যাতে মানুষ, জ্বিন এবং পাখিরা ছিল—যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি অলৌকিক ও বিশাল নিয়ামত। সূরা নামল (২৭:১৭-১৮)-এ বর্ণিত একটি দৃশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সুলাইমান (আ.)-এর বাহিনী চলার পথে একটি পিপীলিকা তার সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলে: “হে পিপীলিকা দল, তোমরা তোমাদের গহ্বরে প্রবেশ করো, যাতে সুলাইমান ও তার বাহিনী তাদের অজান্তে পদদলিত না করে।” সুলাইমান (আ.) পিপীলিকার কথা শুনে হেসে ফেলেন এবং কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে দো’য়া করেন। 


সুলাইমান এই উক্তিতে মৃদু হাসলেন এবং বললেন, ‘হে আমার রব , তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করেছ তার জন্য এবং যাতে আমি তোমার পছন্দমত সৎকাজ করতে পারি। আর তুমি নিজ করুণায় আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের শ্রেণীভুক্ত করে নাও (২৭:১৯)।


এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়, (ক) একজন প্রকৃত নেতা কেবল বড় শক্তির নয়, বরং ছোট প্রাণীর প্রতিও দয়ার মনোভাব পোষণ করেন; (খ) সর্বশ্রেষ্ঠ শাসকরাও যদি অহংকারহীন ও বিনয়ী হন, তবেই তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন; (গ) একটি পিপীলিকার মতো ছোট প্রাণীর ভাষা বোঝার ক্ষমতা সুলাইমান (আ.)-এর বিশেষত্ব হলেও, এতে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, যোগাযোগ এবং সজাগ দৃষ্টিভঙ্গির গভীর শিক্ষা রয়েছে; (ঘ) এই ঘটনাটি শিক্ষা দেয়—দো’য়ার মাধ্যমে আল্লাহর নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা এবং বিনয় প্রকাশ করতে হয়; আর প্রকৃত নেতা কখনো পিপিলিকার মত দুর্বলকে অবহেলা করে না। এই ঘটনা ইসলামী নেতৃত্ব ও দাওয়াহর ক্ষেত্রেও এক অনন্য হিকমাহ প্রকাশ করে।


৭. সুলাইমান (আ.)-এর কাহিনীতে নীতিমূলক শিক্ষা এবং হিকমাহ:


_(ক) গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও হুদহুদ পাখির ভূমিকা (সূরা নামল ২৭:২০–২৮):_ হুদহুদ পাখি রাণী বিলকিস ও সাবা-জাতির অবস্থা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে আসে। এতে বোঝা যায়, সুলাইমান (আ.) তথ্যভিত্তিক ও কৌশলী প্রশাসন পরিচালনা করতেন। সুলাইমান (আ.)-এর শাসনব্যবস্থায় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক অত্যন্ত দক্ষ ও সুনিয়ন্ত্রিত ছিল, যা তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ ও তথ্যভিত্তিক প্রশাসনের এক অনন্য উদাহরণ। হুদহুদ পাখি রাণী বিলকিস এবং সাবা-জাতির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য এনে দেয়, যা সুলাইমান (আ.)-কে গুরুত্বপূর্ণ দাওয়াতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। কুরআনের এই বর্ণনার মাধ্যমে এটি অনুমিত যে, সুলাইমান (আ.)-এর গোয়েন্দা ব্যবস্থা কেবল পাখি দিয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁর সেনাবাহিনীতে জ্বিন, মানুষ ও বিহংগকুলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে এক সুসংবদ্ধ এবং বহুস্তরীয় গোয়েন্দা কাঠামো গঠিত ছিল। এটি আধুনিক গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক প্রাচীন, কিন্তু চমৎকার দৃষ্টান্ত।


_(খ) সিংহাসন আনয়ন (সূরা নামল ২৭:৩৮–৪০):_ তিনি চাইলেন রাণী বিলকিসের আগমনের আগেই তাঁর সিংহাসন এনে দেওয়া হোক। কিতাবের জ্ঞানে জ্ঞানী তাঁর এক সভাসদ আল্লাহভীরু ব্যক্তির মাধ্যমে মূহুর্তেই সিংহাসন আনা হয়, এটি ছিল এক অলৌকিক ঘটনা। শিক্ষা: ক্ষমতা আল্লাহর অনুমতিতে সীমাবদ্ধ এবং বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়ার কৌশল। কাঁচের মেঝেতে রাণী বিলকিসের প্রতিক্রিয়া (সূরা নামল ২৭:৪৪): প্রাসাদের স্বচ্ছ কাঁচের মেঝে দেখে রাণী প্রথমে ভয় পান, যা প্রকৃত সত্যের জ্ঞান না থাকলে মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি নিদর্শন। শিক্ষা: বাহ্যিক বাস্তবতা না দেখে গভীরভাবে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব।


_(গ). পিপিলিকার কাহিনীতে প্রতিক্রিয়া (সূরা নামল ২৭:১৮–১৯):_ সুলাইমান (আ.) তাঁর বাহিনীসহ চলার সময় একটি পিপীলিকা তার জাতিকে সতর্ক করে বলে—“সুলাইমান ও তার বাহিনী যেন তাদের অজান্তে তোমাদের পদদলিত না করে।” সুলাইমান (আ.) এ কথা শুনে মুচকি হেসে আনন্দিত হন এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দো‘আ করেন। এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, একজন আদর্শ নেতা কেবল ক্ষমতাশালী নয়, বরং বিনয়ী, সহানুভূতিশীল এবং কৃতজ্ঞচিত্তের অধিকারী হন। এটি ছোট প্রাণীর বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করার দৃষ্টান্ত, যা আমাদের শেখায়—ক্ষমতা যতই বড় হোক, নেতৃত্বে সহমর্মিতা, আত্মসংযম ও কৃতজ্ঞতা অপরিহার্য।


_(ঘ) সুলাইমান (আ.)-এর ঘোড়ার প্রতি মুগ্ধতা ও সালাত মিসের প্রতিক্রিয়া (সূরা সাদ ৩৮:৩১–৩৩):_ একদিন অপরাহ্নে সুলাইমান (আ.)-এর সামনে তাঁর যুদ্ধ প্রস্তুত রথের ঘোড়াসমূহ প্যারেড করা হয়। তিনি ঘোড়াগুলোর সৌন্দর্য, গতি ও শক্তিতে এতটাই মুগ্ধ হন যে, নির্ধারিত সময়ের সালাত আদায় করতে অনেক দেরি করেন। বিষয়টি উপলব্ধি করেই তিনি তীব্র অনুশোচনায় ভোগেন এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুতি হওয়ায় তাৎক্ষণিক আত্মসমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় বলেন: “আমি তো আমার রবের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে ঐশ্বর্যের প্রেমে মগ্ন হয়ে পড়েছি।” এরপর তিনি ঘোড়াগুলোর ঘাড় ও পায়ে হাত বুলাতে থাকেন—যা কেউ কেউ কুরবানির ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, আবার কেউ বলেন এটি ছিল ভালোবাসা ও বিচ্ছেদমূলক প্রতিক্রিয়া। এই ঘটনায় প্রমাণ হয়, এক আদর্শ নেতা ক্ষমতার মধ্যেও আত্মনিয়ন্ত্রণ, তাওবা ও আল্লাহভীতি বজায় রাখেন এবং ইবাদতের চেয়ে দুনিয়ার কিছুই অগ্রাধিকারযোগ্য নয়।


৮. উপসংহার: নবী সুলাইমান (আ.)-এর জীবন ছিল ন্যায়বিচার, জ্ঞান, দাওয়াহ, নেতৃত্ব ও আল্লাহভীতি—এই সব গুণের সমন্বিত প্রতিচ্ছবি। একজন নবী হিসেবে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা থাকলেও, তিনি ছিলেন বিনয়ী, বিচক্ষণ, তাক্বওয়াপূর্ণ এবং সর্বদা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। কুরআনে তাঁর কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে কেবল ইতিহাসের জন্য নয়, বরং প্রতিটি প্রজন্মের জন্য আদর্শ নীতিমালার নিদর্শন হিসেবে। আজকের পৃথিবীর জন্য, যেখানে নেতৃত্বে সততা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর—সেখানে সুলাইমান (আ.)-এর জীবন একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন*। (মূসা: ২৭-০৬-২৫)।

Wednesday, June 25, 2025

ব্রিটিশবিরোধী বীর নারী মুক্তিযুদ্ধা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

 প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার  ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ। তিনি উপমহাদেশের প্রথম মহিলা শহীদ বিপ্লবী হিসেবে পরিচিত।


সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

- পুরো নাম: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার  

- জন্ম*: ৫ মে ১৯১১, পহরপুর, চট্টগ্রাম  

- মৃত্যু :  ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণকালে  

- পেশা : বিপ্লবী ও শিক্ষিকা  

- শিক্ষা : বেথুন কলেজ, কলকাতা (ফিলোসফিতে অনার্স)


অবদান:

- ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের একজন সাহসী যোদ্ধা।

- মাস্টারদা *সুর্য সেনের নেতৃত্বে* "চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন" ও পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেন।

- *পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব* (যেখানে লেখা ছিল "Dogs and Indians not allowed") আক্রমণ অভিযানে নেতৃত্ব দেন এবং শেষ মুহূর্তে ধরা না পড়তে *সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন*।


প্রীতিলতার আত্মত্যাগ আজও দেশের নারী সমাজ ও তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা।  

তাঁর নামে বাংলাদেশে বহু স্কুল, কলেজ, সড়ক ও ভবনের নামকরণ করা হয়েছে।  

*প্রীতিলতা হলেন সাহস, আত্মত্যাগ ও জাতির জন্য আত্মনিবেদনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।*

Sunday, June 15, 2025

বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সহকারি কাজের চাপ কেমন

 ★বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সহকারীদের কাজের চাপ সাধারণত বেশ বেশি, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে। জনবল সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্বাস্থ্য সহকারীদের একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপে ফেলে।


🏥 স্বাস্থ্য সহকারীদের কাজের চাপের প্রধান কারণসমূহ:


১। জনবল সংকট:

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট প্রকট। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, ফলে বিদ্যমান কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ে। 


২। প্রশিক্ষণের অভাব:অনেক স্বাস্থ্য সহকারী পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় তাদের একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা কাজের চাপ বাড়িয়ে দেয়। 


 ৩।কাজের পরিবেশ: কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশের অভাব, যেমন অপরিচ্ছন্নতা, আলোকস্বল্পতা এবং বাতাস চলাচলের সমস্যা, স্বাস্থ্য সহকারীদের মানসিক ও শারীরিক চাপ বাড়ায়। 


৪।সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ:

রোগীর স্বজনদের অসদাচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব এবং পদোন্নতির অভাব স্বাস্থ্য সহকারীদের পেশাগত চাপ বাড়ায়। 


✅ করণীয়:


★প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন:

স্বাস্থ্য সহকারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।


★জনবল বৃদ্ধি:

স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের মাধ্যমে কাজের চাপ হ্রাস করা।

Wednesday, June 4, 2025

সত্যিকারের ভালোবাসা মানে কি

 

১।তাকে আপনি হিসেবে দেখা, জিনিস না:

   শুধু নিজের চাওয়া নয়, তার অনুভূতি, স্বপ্ন, ভয়,সবকিছু বুঝে নেয়া।


২।ভালো সময়েই নয়, খারাপ সময়েও পাশে থাকা:

   প্রেম শুধু মিষ্টি কথা নয়—সাপোর্ট, ভরসা, সহানুভূতি।


৩।সত্য বলা:

   মিথ্যা দিয়ে মুগ্ধ করলেও সেটা স্থায়ী হয় না। সত্যিকথা বললে বিশ্বাস তৈরি হয়।


৪৷ তার স্বাধীনতা ও মতামতকে সম্মান করা:  

   ভালোবাসা মানে কন্ট্রোল না — মানে একসাথে চলা।




দানকারী প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ শ্রদ্ধেয় ড. আবদুল করিম

 

সমগ্র বাংলা কিংবা উপমহাদেশের মুসলমান শাসকদের পূর্নাঙ্গ ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দানকারী প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ শ্রদ্ধেয় ড. আবদুল করিম। 


তিনি বাঁশখালি উপজেলার চঁপাছড়ি গ্রামে ১৯২৮ সালের পহেলা জুন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ ওয়াইজুদ্দিন, মাতার নাম সৈয়দা রাশিদা খাতুন। তার প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় মাদ্রাসা দিয়ে। পরবর্তীতে মাদ্রাসা থেকে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমানে হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজ) ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি ১৯৪৪ সালে প্রথম বিভাগে হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় ২ স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৬ সালে প্রথম বিভাগ থেকে ৮ম স্থান অধিকার করে 'আইএ' পাশ করেন। অতপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৪৯ সালে ২য় শ্রেনিতে বি.এ পাস করেন। ১৯৫০ সালে একই বিভাগ থেকে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। 


তিনি অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর অনুপ্রেরণায় গবেষণা শুরু করেন। অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর তত্ত্বাবধানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর পিএইচডি শিরোনাম ছিল ‘Social History of the Muslims in Bengal’ যা পরে পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৬০-৬১ সালে আবদুল করিম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের 'School of Oriental and African Studies' থেকে ‘Murshid Quli Khan and His Times’ শিরোনামে দ্বিতীয় পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এটিও পরে পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এ ছিল তার দীর্ঘ শিক্ষা জীবন। 


তিনি পিএইচডি করার আগে অর্থাৎ এম.এ পাস করার পরপরই ১৯৫১ সালে ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সহকারী হাউস টিউটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।


১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি ঐ হলের হাউস টিউটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তিনি নিজ এলাকার মায়ার টানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ১৯৬৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলের প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।১৯৬৯ সালে  তিনি অধ্যাপক পদে উন্নিত হন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৫-১৯৮১ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে  ১৯৮৪ সালে তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের ইতি ঘটে। 


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরে যাওয়ার পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ এ সিনিয়র ফেলো হিসেবে যোগ দেন। এ সময়ে (১৯৮৯-১৯৯০) তিনি দুই খন্ডে বাংলায় মুঘলদের ইতিহাস রচনা করেন যা পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। 


অধ্যাপক আবদুল করিমের পান্ডিত্য এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানের জন্য ২০০১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক অধ্যাপক ইমেরিটাস নিযুক্ত করে। 


তার প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো হলো: 

১. বাংলার ইতিহাস ( সুলতানি আমল),

২. বাংলার ইতিহাস ( মুঘল আমল), 

৩.বাংলার ইতিহাস : মুসলিম বিজয় থেকল সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত (১২০০-১৮৫৭) এবং 

৪.  চট্টগ্রামে ইসলাম।

এগুলো ছিল ওনার বাংলা ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থ। 


তাছাড়া তার ইংরেজি ভাষায় ও বহু গ্রন্থ ছিল। যথা - 


১. সোশ্যাল হিস্টরি অফ দ্যা মুসলিম ইন বেঙ্গল।

২. মুর্শিখুলি খান এন্ড হিজ টাইম, 

৩. কার্পাস অফ দি অ্যারাবিক এন্ড পার্সিয়ান ইনস্ক্রিপশন, 

৪. ঢাকা দ্যা মুঘল ক্যাপিটাল ও 

৫. দ্যা রোহিঙ্গাস : এ শর্ট অ্যাকাউন্ট অফ দেয়ার হিস্টোরি এন্ড কালচার ইত্যাদি। 


২০০৭ সালের ২৪ জুলাই চট্টগ্রামে এই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 


তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নিরলস ভাবে ইতিহাস গবেষণায় কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে বাংলা ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন। আবার উপমহাদেশের মুসলিম শাসন বা মধ্য যুগের ইতিহাস নিয়ে ও কাজ করেছেন। তার এসকল গভেষণাকর্ম তাকে একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হিসাবে ইতিহাসে স্থান করে দিয়েছে। যার নিরলস পরিশ্রমের কারণে আজ আমরা বাংলা কিংবা উপমহাদেশের মধ্যেযুগের এত সুন্দর ইতিহাস পড়তে পারি। যার গুরুত্ব আমরা ইতিহাস পড়ুয়ারা প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করি। আজ এ মহান ইতিহাসবিদকে তার জন্মদিন উপলক্ষে গভীর শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি। লেখক : হাসনাত হাসান রাহাত ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

নদীর পাড়ে

নদীর পাড়ে বসে আজ, চুপচাপ দেখি স্রোতের খেলা, হৃদয়ের মাঝে জমে থাকা কথা, বয়ে যায় যেন সময়ের ভেলা। হাওয়ার ছোঁয়ায় দোলে মন, প্রকৃতি গায় নীরব গান, জ...