Wednesday, June 4, 2025

দানকারী প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ শ্রদ্ধেয় ড. আবদুল করিম

 

সমগ্র বাংলা কিংবা উপমহাদেশের মুসলমান শাসকদের পূর্নাঙ্গ ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দানকারী প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ শ্রদ্ধেয় ড. আবদুল করিম। 


তিনি বাঁশখালি উপজেলার চঁপাছড়ি গ্রামে ১৯২৮ সালের পহেলা জুন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ ওয়াইজুদ্দিন, মাতার নাম সৈয়দা রাশিদা খাতুন। তার প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় মাদ্রাসা দিয়ে। পরবর্তীতে মাদ্রাসা থেকে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমানে হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজ) ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি ১৯৪৪ সালে প্রথম বিভাগে হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় ২ স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৬ সালে প্রথম বিভাগ থেকে ৮ম স্থান অধিকার করে 'আইএ' পাশ করেন। অতপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৪৯ সালে ২য় শ্রেনিতে বি.এ পাস করেন। ১৯৫০ সালে একই বিভাগ থেকে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। 


তিনি অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর অনুপ্রেরণায় গবেষণা শুরু করেন। অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর তত্ত্বাবধানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর পিএইচডি শিরোনাম ছিল ‘Social History of the Muslims in Bengal’ যা পরে পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৬০-৬১ সালে আবদুল করিম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের 'School of Oriental and African Studies' থেকে ‘Murshid Quli Khan and His Times’ শিরোনামে দ্বিতীয় পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এটিও পরে পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এ ছিল তার দীর্ঘ শিক্ষা জীবন। 


তিনি পিএইচডি করার আগে অর্থাৎ এম.এ পাস করার পরপরই ১৯৫১ সালে ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সহকারী হাউস টিউটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।


১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি ঐ হলের হাউস টিউটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তিনি নিজ এলাকার মায়ার টানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ১৯৬৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলের প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।১৯৬৯ সালে  তিনি অধ্যাপক পদে উন্নিত হন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৫-১৯৮১ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে  ১৯৮৪ সালে তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের ইতি ঘটে। 


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরে যাওয়ার পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ এ সিনিয়র ফেলো হিসেবে যোগ দেন। এ সময়ে (১৯৮৯-১৯৯০) তিনি দুই খন্ডে বাংলায় মুঘলদের ইতিহাস রচনা করেন যা পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। 


অধ্যাপক আবদুল করিমের পান্ডিত্য এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানের জন্য ২০০১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক অধ্যাপক ইমেরিটাস নিযুক্ত করে। 


তার প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো হলো: 

১. বাংলার ইতিহাস ( সুলতানি আমল),

২. বাংলার ইতিহাস ( মুঘল আমল), 

৩.বাংলার ইতিহাস : মুসলিম বিজয় থেকল সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত (১২০০-১৮৫৭) এবং 

৪.  চট্টগ্রামে ইসলাম।

এগুলো ছিল ওনার বাংলা ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থ। 


তাছাড়া তার ইংরেজি ভাষায় ও বহু গ্রন্থ ছিল। যথা - 


১. সোশ্যাল হিস্টরি অফ দ্যা মুসলিম ইন বেঙ্গল।

২. মুর্শিখুলি খান এন্ড হিজ টাইম, 

৩. কার্পাস অফ দি অ্যারাবিক এন্ড পার্সিয়ান ইনস্ক্রিপশন, 

৪. ঢাকা দ্যা মুঘল ক্যাপিটাল ও 

৫. দ্যা রোহিঙ্গাস : এ শর্ট অ্যাকাউন্ট অফ দেয়ার হিস্টোরি এন্ড কালচার ইত্যাদি। 


২০০৭ সালের ২৪ জুলাই চট্টগ্রামে এই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 


তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নিরলস ভাবে ইতিহাস গবেষণায় কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে বাংলা ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন। আবার উপমহাদেশের মুসলিম শাসন বা মধ্য যুগের ইতিহাস নিয়ে ও কাজ করেছেন। তার এসকল গভেষণাকর্ম তাকে একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হিসাবে ইতিহাসে স্থান করে দিয়েছে। যার নিরলস পরিশ্রমের কারণে আজ আমরা বাংলা কিংবা উপমহাদেশের মধ্যেযুগের এত সুন্দর ইতিহাস পড়তে পারি। যার গুরুত্ব আমরা ইতিহাস পড়ুয়ারা প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করি। আজ এ মহান ইতিহাসবিদকে তার জন্মদিন উপলক্ষে গভীর শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি। লেখক : হাসনাত হাসান রাহাত ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

1 comment:

নদীর পাড়ে

নদীর পাড়ে বসে আজ, চুপচাপ দেখি স্রোতের খেলা, হৃদয়ের মাঝে জমে থাকা কথা, বয়ে যায় যেন সময়ের ভেলা। হাওয়ার ছোঁয়ায় দোলে মন, প্রকৃতি গায় নীরব গান, জ...