বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্স বাংলাদেশভিত্তিক হ্যাকারদের সংগঠন যেটি মূলত আলোচনায় আসে ভারতের বিরুদ্ধে সাইবার যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে। ভারত সরকারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক সীমান্ত হত্যা, টিপাইমুখ বাধ নির্মাণ প্রভৃতি ইস্যু এই সাইবার যুদ্ধের ইন্ধন যোগায়। বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্স এই সাইবার যুদ্ধ ঘোষণা করলেও পরবর্তীকালে বাংলাদেশভিত্তিক অপর দুই হ্যাকার গ্রুপ বাংলাদেশ সাইবার আর্মি এবং এক্সপায়ার সাইবার আর্মিও তাদের সাথে যোগ দেয়।
মার্চ ২০১৫-এ ভারতীয় রাজনীতিবিদ শশী থারুর দ্বারা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় নিয়ে কটুক্তির কারণে তার ওয়েবসাইট এই গোষ্ঠী হ্যাক করে।
বাংলাদেশ-ভারত সাইবার-যুদ্ধ
২০১২ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত ইন্টারনেটে সংঘটিত পাল্টাপাল্টি হ্যাকিং কার্যক্রমকে বোঝানো হচ্ছে। এধরনের সাইবার-যুদ্ধের ঘটন ২০০৭-এ এস্তোনিয়ায় হলেও দুটো দেশের মধ্যে এজাতীয় ঘটনা সহজদৃষ্ট নয়। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার এই ঘটনার সূত্রপাত মূলত হয়, ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসের ৯ ও ১০ তারিখ। ভারত সীমান্তে একজন বাংলাদেশীকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক উলঙ্গ করে নির্যাতনকে কেন্দ্র করে। তবে কারণ হিসেবে এটি একমাত্র ছিল না, বস্তুত সমকালীন আরো সীমান্ত-হত্যা এবং ভারত সরকার কর্তৃক টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্তও এই সাইবার-যুদ্ধের ইন্ধন ছিল। এই সাইবার আক্রমণের পিছনে বাংলাদেশের তিনটি হ্যাকার-দল, যারা নিজেদেরকে বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারস, বাংলাদেশ সাইবার আর্মি এবং এক্সপায়ার সাইবার আর্মি নামে পরিচয় দেয়, নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে। এই দল-তিনটি তাদের সাথে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হ্যাকার-দল অ্যানোনিমাস-এর সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করে। এছাড়াও পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরবের হ্যাকাররা বাংলাদেশী হ্যাকারদের সমর্থন দিচ্ছেন বলে সংবাদ-মাধ্যমে উল্লেখ করা হয়।যদিও, পরবর্তীতে তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে এবং দাবী করা হয় তথ্যগুলো অতি উৎসাহী সমর্থকদের মস্তিষ্কপ্রসূত। তবে উল্লেখ্য, ভারত-সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা-সংক্রান্ত খবরের প্রচারই এই সাইবার-যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা একই সময়ে ভারতীয় হ্যাকার-দলও এই আক্রমণে প্রতি-আক্রমণ করে, যার নেতৃত্ব দেয় ইন্ডিশেল নামক হ্যাকার দল। এদের পাশাপাশি ইন্ডিয়ান সাইবার আর্মিও নিজেদের সম্পৃক্ততা ঘোষণা করে।
সাইবার-যুদ্ধের বিবরণ
যেহেতু বাংলাদেশীরা ভারত কর্তৃক নির্যাতিত, তাই বাংলাদেশের হ্যাকাররাই ভারতীয় ওয়েবসাইটে আক্রমণের সূচনা করে বলে ধারণা করা হয়, এমনকি প্রথমে সংবাদ-মাধ্যমে তেমনটাই প্রকাশিত হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১২ রাত থেকে ব্যাপক আক্রমণ চালানো হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।প্রথমেই মহারাষ্ট্র পুলিশের ওয়েবসাইট আক্রমণের মাধ্যমে ভারতীয় ওয়েবসাইট হ্যাক করা শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশী হ্যাকার-গোষ্ঠী পরবর্তিতে দাবি করে, ভারতীয় হ্যাকাররাই এই সাইবার-যুদ্ধের সূচনা করে, আর তারই জবাবে বাংলাদেশী হ্যাকারদের এই প্রতি-আক্রমণ। বাংলাদেশী হ্যাকাররা আক্রমণের প্রাথমিক ধাপে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী'র (বিএসএফ) ওয়েবসাইট হ্যাক করে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলে।পরবর্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারি, বিএসএফ-এর বিকল্প ওয়েবসাইটও (www.bsf.nic.in) আক্রমণ করে এর সোর্সকোড উন্মুক্ত করে দেয় বাংলাদেশী হ্যাকাররা। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটে আক্রমণ চালায় তারা। এই আক্রমণের পাশাপাশি হ্যাকাররা নিজেদের ফেসবুক পেজ এবং বিভিন্ন ব্লগ ওয়েবসাইটে তাদের কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবৃতি দিতে থাকে, আর প্রকাশ করতে থাকে হ্যাক করা ওয়েবসাইটগুলোর ঠিকানা। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২ বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্স জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং ওয়েবসাইট ইউটিউব-এ ভারত সরকারের প্রতি একটি ভিডিও প্রকাশ করে।
ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশ আর কালো আলখাল্লা পরিহীত একজন লোক হাতে একটি কাগজ নিয়ে টেবিলের ওপাশ থেকে বসে কথা বলছেন। তার কথাগুলো যন্ত্রের কথনে শোনা যাচ্ছে। মুখোশের আদল পুরোপুরি অ্যানোনিমাস-এর মুখোশের সাথে মিলে যায়। মুখোশ পরিহিত ব্যক্তি যে বক্তব্যটি দেন, তা ছিল:
“
হ্যালো বাংলাদেশের নাগরিকরা, আমরা বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারস। এখন সময় আমাদের চোখ খুলবার। বিএসএফ এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে, তাদের গুলিতে আহত হয়েছে আরও ৯৮৭ বাংলাদেশি। অপহৃত হয়েছে হাজারো মানুষ। এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তারা অবিচার করছে। সংকটময় এ মুহূর্তে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে আমাদের কিছু দায়িত্ববোধ রয়েছে, আমরা চাই ভারত সরকার নিরপরাধ বাংলাদেশিদের হত্যা করা বন্ধ করুক। নতুবা আমরা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে সাইবার-যুদ্ধ শুরু করব। এটি চলতেই থাকবে।
”
এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশী হ্যাকারদের অনবরত সাইবার আক্রমণের প্রতিবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন ওয়েবসাইটও হ্যাক হতে শুরু করে, এই তালিকায় বাংলাদেশের কিছু সরকারি ওয়েবসাইটও ছিল। ভারতীয় হ্যাকার-দল ইন্ডিশেল অনেকগুলো ভারতীয় ওয়েবসাইট থেকে বাংলাদেশি হ্যাকারদের হটিয়ে দিয়ে রোববার রাত পর্যন্ত সময় দেয় বলে সংবাদ-মাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়। এই সময়ের মধ্যে ভারতের সাইটগুলোতে আক্রমণ বন্ধ না করলে বাংলাদেশের ওয়েবসাইটগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলে ইন্ডিশেল হুমকি দেয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২ বাংলাদেশের এরকম কিছু ওয়েবসাইট হ্যাকের খবর প্রকাশিত হয় বিবিসি বাংলায়। অবশ্য এরকম আক্রমণের জবাব দিতে বাংলাদেশী হ্যাকার-দলগুলো ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ ভারতের কয়েকশ' ওয়েবসাইটও হ্যাক করে বলে বিবিসি বাংলার ঐ খবরেই তথ্যপ্রকাশ হয়।বাংলাদেশী সংবাদ-মাধ্যমগুলো এই হ্যাকিং-এর পিছনে ইন্ডিয়ান সাইবার আর্মি নামক একদল হ্যাকারের সম্পৃক্ততার খবর প্রকাশ করে।১৫ ফেব্রুয়ারি নাগাদ বাংলাদেশী সংবাদ-মাধ্যম জানায়, ভারতীয় প্রায় ২০,০০০-এর অধিক ওয়েবসাইট এই আক্রমণের কারণে আংশিক বা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়।
এই আক্রমণে অধিক পরিমাণে ভারতীয় ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ায় ভারতীয় হ্যাকাররা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে বলে সংবাদ বেরোয়। সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ভারতীয় হ্যাকাররা বিভিন্ন বাংলাদেশী ওয়েবসাইট হ্যাক করে বাংলাদেশী হ্যাকারদের উপর দোষ চাপিয়ে দিতে থাকে। সংবাদে www.publiclibrary.gov.bd ওয়েবসাইটের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ভারতীয় হ্যাকাররা ওয়েবসাইটটি হ্যাক করে লিখে রাখে: HackeD bY BD BLACK HAT TEAM।যদিও এজাতীয় সংবাদ বাংলাদেশী সংবাদ-মাধ্যমগুলোতে ছাপা হলেও ভারতীয় সংবাদ-মাধ্যমে এরকম কোনো সংবাদ ছাপা হয়নি।
সাইবার-যুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় ওয়েবসাইটে আক্রমণের পাশাপাশি বাংলাদেশী হ্যাকাররা বাংলাদেশী বিভিন্ন ওয়েবসাইটের জন্য নিরাপত্তা পরামর্শও দিতে থাকে।
No comments:
Post a Comment