Monday, May 5, 2025

বাংলাদেশ কি এখন ভারতের জন্য পাকিস্তানের চেয়েও বড় হুমকি

 

ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব একটি চিরন্তন কূটনৈতিক নাটক। যুদ্ধ, সন্ত্রাস, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক কিংবা কারগিল—এই দুই দেশের সম্পর্ক বারবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে, আবার সময়ের সাথে সাথে ঠান্ডাও হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক জটিল বাস্তবতা ভারতের সামনে এক নতুন চিন্তার দরজা খুলে দিয়েছে—এবারের হুমকি পশ্চিম নয়, বরং পূর্ব দিক থেকে। প্রশ্ন উঠছে, ভারত কি এখন বাংলাদেশের দিকেই বেশি সতর্ক?


বাংলাদেশ, একসময় ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে অর্জিত এই সম্পর্ক আজ এমন মোড় নিয়েছে যেখানে ভারতের নীতিনির্ধারকরা পূর্ব সীমান্ত নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় পড়ছেন। এর বড় কারণ হলো বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের (সেভেন সিস্টার্স) প্রবেশদ্বার। এই অঞ্চল ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া 'চিকেন’স নেক' করিডোর দিয়ে সংযুক্ত। এই সংকীর্ণ পথ ভারতের কৌশলগত দুর্বলতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।


সম্প্রতি মুহাম্মদ ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, সাবেক মেজর জেনারেল ফজলুর রহমান, প্রকাশ্যে দাবি করেছেন—“যদি ভারত পাকিস্তানে হামলা করে, বাংলাদেশকে ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য দখল করতে হবে। এজন্য চীনের সঙ্গে যৌথ সামরিক সহযোগিতার আলোচনা শুরু করা জরুরি।” এমন বক্তব্য ভারতের কূটনৈতিক মহলে শুধু আতঙ্ক নয়, বরং বিস্ময়েরও জন্ম দিয়েছে। কারণ পাকিস্তান বহুবার যুদ্ধের হুমকি দিলেও, এভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চল দখলের পরিকল্পনা এত প্রকাশ্যভাবে আর কেউ দেয়নি।


এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে—এই বক্তব্য একা ফজলুর রহমানের নয়। বর্তমান বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার ছোট থেকে বড় সব অংশের মধ্যে এখন যেন এক অদ্ভুত ঐকমত্য গড়ে উঠছে এই নিয়ে। কেউ সরাসরি যুদ্ধের কথা বলছে, কেউ বলছে "বাংলাদেশই এই অঞ্চলের একমাত্র সমুদ্র অভিভাবক", কেউ আবার বলছে "এই অঞ্চল চীনের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের স্বর্ণদ্বার হতে পারে"। একদিকে ইউনূস, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সাবেক সামরিক কর্তা, তৃতীয়দিকে সরব প্রশাসন, সবায় যেন প্রস্তুত —এই ত্রিমুখী সম্মতিই ভারতকে ভাবিয়ে তুলছে সবচেয়ে বেশি।


বস্তুত, বাংলাদেশে এই ‘চিকেন নেক ফ্যান্টাসি’র শুরু আজকের নয়। পাকিস্তান আমলে ভারতকে পূর্ব দিক থেকে ঘায়েল করার কৌশল ছিল একদা পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক কৌশলবিদদের প্রিয় বিষয়। ১৯৭১ সালের পর সেই স্বপ্ন নষ্ট হলেও, আজ আবার চীনের কূটনৈতিক উস্কানি, ইসলামী মৌলবাদের ছায়া, ও এক অন্তঃসারশূন্য সরকারপ্রধানের মাধ্যমে সেই ভূত আবার ফিরে এসেছে। আজকের বাংলাদেশ যেন হয়ে উঠছে পাকিস্তানের নতুন মুখোশ পরে ভারতের পূর্ব সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধূর্ত প্রতিবেশী।


অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধের হুমকি অনেকটাই পুরনো এবং প্রত্যাশিত। দুই দেশই জানে, কোন সীমা পর্যন্ত উত্তেজনা গড়াবে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি চীনের সহায়তায় আচমকা এক সাঁড়াশি কৌশল নেয়—তাহলে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। এই অঞ্চলটি বর্তমানে ভারতের ‘BIMSTEC সংযোগকেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে উঠছে, যেখানে রেল, সড়ক, নৌপথ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাইপলাইন গড়ে তোলা হচ্ছে। এই অংশ কাটা গেলে ভারতের পূর্বাঞ্চল প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।


ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদ, ধর্মীয় উত্তেজনা ও নৃগোষ্ঠীগত সমস্যা আগে থেকেই ছিল। সেখানে বাংলাদেশ যদি ‘মার্কেটপ্লেস অব ইসলামিজম’ হয়ে ওঠে এবং সেই সঙ্গে চীনের সহায়তা পায়, তাহলে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নতুন মাত্রায় বিপদগ্রস্ত হবে।


তারও চেয়েও বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশ এখন চীনের Belt and Road Initiative (BRI)-এর অংশ হতে চায়। বন্দরে চীনা বিনিয়োগ, নৌবাহিনীর কূটনৈতিক উপস্থিতি ও চীনা সামরিক ড্রোন চুক্তি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যে, ভারত এখন আর বাংলাদেশকে নিছক বন্ধুদেশ হিসেবে দেখে না। বরং এক সম্ভাব্য ‘পূর্ব ফ্রন্ট’ হিসেবে জরুরিভাবে বিশ্লেষণ করছে।


1 comment:

নদীর পাড়ে

নদীর পাড়ে বসে আজ, চুপচাপ দেখি স্রোতের খেলা, হৃদয়ের মাঝে জমে থাকা কথা, বয়ে যায় যেন সময়ের ভেলা। হাওয়ার ছোঁয়ায় দোলে মন, প্রকৃতি গায় নীরব গান, জ...