কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও বহুবর্ণিল। তাঁর জীবন, সাহিত্য ও ব্যক্তিত্বের অনেক দিক আমাদের অনেকেরই অজানা। নজরুল-গবেষকদের লেখা বিভিন্ন বই ও পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা এমনই ২০টি তথ্য এখানে তুলে ধরা হলো, যেগুলো হয়তো আপনি আগে জানতেন না।
১. নিয়মের গণ্ডিতে বাঁধা ছিলেন না
নজরুলের জীবন ছিল স্বাধীনচেতা। যখন যা ভালো লাগত, তিনি তা-ই করতেন। দিন-রাতের হিসাব না করে হঠাৎ করেই বন্ধুদের বাড়িতে হাজির হয়ে যেতেন, চলত আড্ডা আর গান।
২. লেখার জন্য বিশেষ পরিবেশের প্রয়োজন হতো না
গাছতলায় বসে যেমন লিখতে পারতেন, তেমনি ঘরোয়া বৈঠকেও তাঁর কলম চলত অবিরাম।
৩. রঙিন পোশাক পরার পেছনে যুক্তি
নজরুল ঝলমলে রঙিন পোশাক পরতে ভালোবাসতেন। কারণ হিসেবে তিনি বলতেন, "রঙিন পোশাক পরি অনেক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।"
৪. ছিল অসাধারণ পাঠাভ্যাস
তিনি কোরআন, গীতা, বাইবেল, বেদ, ত্রিপিটক, মহাভারত, রামায়ণ পড়তেন। একই সঙ্গে শেলি, কিটস, কার্ল মার্ক্স, ম্যাক্সিম গোর্কির রচনাও ছিল তাঁর পাঠ্যতালিকায়। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’-এর সব গান ছিল তাঁর মুখস্থ!
৫. বাংলার সবচেয়ে বহুমুখী গীতিকার
নজরুল সব ধরনের বিষয়ে গান লিখেছেন। যদিও অনেকে তাঁর গানের সংখ্যা ৪,০০০ বলে, তবে প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৮,০০০, যার অধিকাংশ সংরক্ষিত হয়নি।
৬. ছিলেন চূড়ান্ত রসিক
নজরুলের কথায় হাসির ঝড় উঠত। একবার এক মহিলা তাঁকে স্মার্টলি জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি কি পানাসক্ত?" নজরুল উত্তর দিলেন, "না, বেশ্যাসক্ত!" মহিলাটি চমকে গেলে তিনি ব্যাখ্যা করলেন, "পান বেশি খাই, তাই বেশ্যাসক্ত (বেশি+আসক্ত)!"
৭. নজরুলের প্রেমে পড়েননি, এমন মানুষ কম
কবি বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, "আমি প্রথম নজরুলকে দেখেই তাঁর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম!" আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর স্ত্রী প্রতিভা বসুও নজরুলের প্রেমে পড়েছিলেন এবং এ নিয়ে তিনি ‘আয়না’ নামে একটি গল্প লিখেছেন।
৮. প্রচুর পান ও চা খেতেন
লিখতে বসার আগে এক থালা পান ও প্রচুর চা নিয়ে বসতেন। তাঁর উক্তি ছিল—
"লেখক যদি হতে চান, লাখ পেয়ালা চা খান!"
৯. ছিলেন দক্ষ হস্তরেখাবিশারদ
তিনি মানুষের হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিতেন। এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, "আপনার বিদেশযাত্রা আছে," এবং কিছুদিন পরেই সে বিদেশ চলে যায়!
১০. রাগলে বই-খাতা ছিঁড়ে ফেলতেন
রাগান্বিত হলে হাতের কাছে যা পেতেন, তাই ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলতেন।
১১. অর্থের ব্যাপারে ছিলেন বেহিসাবি
হাতে টাকা এলেই বন্ধুদের নিয়ে আনন্দে উড়িয়ে দিতেন। বলতেন, "আমি আমার টাকা বন্ধুদের জন্য খরচ করছি। ওদের হলে ওরাও আমার জন্য খরচ করবে!"
১২. সন্তানদের নাম বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে
তাঁর দুই পুত্রের ডাকনাম ছিল সানি (কাজী সব্যসাচী) ও নিনি (কাজী অনিরুদ্ধ), যা রাখা হয়েছিল সান ইয়াত-সেন ও লেনিনের নামে।
১৩. সন্তানদের প্রতি অসীম ভালোবাসা
তিনি নিজ হাতে ছেলেদের খাওয়াতেন এবং ছড়া কাটতেন—
"সানি-নিনি দুই ভাই, ব্যাঙ মারে ঠুই ঠাই!"
১৪. ছিলেন প্রকৃত জনদরদি
একবার দরিদ্র এক হিন্দু মেয়ের বিয়েতে তিনি নিজে বাজার করে দিয়ে কন্যাদান করেছিলেন।
১৫. কবিতা ও গানের স্বত্ব বিক্রি করে গাড়ি কেনেন
নজরুল তাঁর লেখা বিক্রি করে বিলাসবহুল ক্রাইসলার গাড়ি কিনেছিলেন, যা সে সময়ের সবচেয়ে দামি গাড়িগুলোর একটি ছিল।
১৬. বিলাসবহুল প্রমোদভ্রমণ করতেন
তিনি মাঝেমধ্যে ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরা ভাড়া করে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যেতেন।
১৭. ছিলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন
তিনি অন্ধকারেও বহুদূরের বস্তু স্পষ্ট দেখতে পেতেন।
১৮. ছিলেন অসম্ভব ক্রীড়াপ্রেমী
ফুটবল খেলায় তিনি এতটাই মগ্ন থাকতেন যে, একবার খেলা দেখতে গিয়ে নিজের দুই ছেলেকে হারিয়ে ফেলেন এবং সারা মাঠে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন—
"সানি কোথায়? নিনি কোথায়?"
১৯. ছিলেন দক্ষ দাবাড়ু
যেদিন বিশেষ কোনো কাজ থাকত না, সেদিন তিনি দাবা খেলায় মগ্ন থাকতেন।
২০. মাঠের খেলাতেও ছিল নজরুলের উত্তেজনা
ছেলে সানি একবার ক্রিকেট খেলায় ছক্কা মারলে তিনি এতটাই উত্তেজিত হয়ে পরের বলেও ছক্কা মারতে বললেন! কিন্তু সানির ব্যাট উইকেটকিপারের মুখে গিয়ে লাগল, আর খেলা বন্ধ হয়ে গেল!
@followers
ReplyDelete